নিজস্ব প্রতিবেদক, মুন্সিগঞ্জ:
মুন্সিগঞ্জ সদর থানাধীন পশ্চিম মুক্তারপুর শাহ সিমেন্ট ঘাট ও ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী জাহাজ ও কার্গো এসে নোঙর করে এই ঘাটে। এসব জাহাজের হাজার হাজার শ্রমিক নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার-সদায়, কাঁচামাল ও মাছ কেনার জন্য এই এলাকায় ওঠানামা করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠী ও সাধারণ পথচারীরা এখন এই এলাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার (৩১ মে) রাত আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে পশ্চিম মুক্তারপুর ব্রিজের ঢালে ঘটে এক দুঃসাহসিক ছিনতাইয়ের চেষ্টা। তবে এবার স্থানীয় জনতার সাহসিকতায় পার পায়নি অপরাধীরা।
জনতার প্রতিরোধ: যেভাবে ধরা পড়ল আন্তঃজেলা অপরাধী চক্র
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাসির হোসাইন (২৮) নামে এক যুবক ব্রিজের ঢাল দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তিন ছিনতাইকারী তাকে ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখায়। মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে নাসির চিৎকার করে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তার চিৎকার শুনে আশপাশের সচেতন জনতা দ্রুত এগিয়ে এসে ধাওয়া করে তিনজনের মধ্যে দুজনকে আটকে ফেলেন, তবে একজন কৌশলে পালিয়ে যায়।
আটককৃতরা হলো— আন্তঃজেলা অপরাধী চক্রের সদস্য শরীফ (৪০) ও রুবেল (৩৫)। উত্তেজিত জনতা তাদের গণপিটুনি দিলে মুন্সিগঞ্জ থানার টহল পুলিশ দ্রুত এসে তাদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। পুলিশ জানায়, আটক শরীফের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও খুলনা জেলায় একাধিক মামলা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, এটি কোনো স্থানীয় সাধারণ পকেটমার দল নয়, বরং দূর-দূরান্ত থেকে আসা এক সুসংগঠিত অপরাধী চক্র!
ভয়ংকর তথ্য: দূর থেকে এসে যেভাবে চলে অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ‘ব্লু-প্রিন্ট’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটির অপরাধের ধরন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ভয়ংকর। তারা দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে মুন্সিগঞ্জের এই ব্যস্ততম ঘাট এলাকাকে টার্গেট করে। এদের অপরাধের মূল কৌশলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
টার্গেট সিলেকশন ও ছদ্মবেশ: এরা ঘাটে এসে সাধারণ যাত্রী বা ক্রেতার ছদ্মবেশে ঘোরাঘুরি করে। কোন নৌ-শ্রমিক বা পথচারীর কাছে বেশি টাকা বা দামি মোবাইল আছে, তা দূর থেকে রেকি (Reke) করে।
ব্রিজের ঢালে ওত পেতে থাকা: মুক্তারপুর ব্রিজের নিচের অন্ধকার ও নির্জন কোণগুলোকে এরা ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে। সুযোগ বুঝেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অন্ধকার স্পটে টেনে নিয়ে যায়।
চলন্ত গাড়িতে দ্রুত অপহরণ ও দূর-দূরান্তে পাচার: কেবল ছিনতাই নয়, এই চক্রের মূল ভয়ংকর রূপ হলো অপহরণ। শ্রমিকরা বাইরের জেলা থেকে আসায় এখানকার রাস্তাঘাট ভালো চেনেন না। অপরাধীরা ব্রিজের ওপর বা আশেপাশে আগে থেকেই সিএনজি, মাইক্রোবাস বা মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে প্রস্তুত রাখে। জিম্মি করার পরপরই ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে দ্রুত এলাকা পার করে দেয়।
মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়: চলন্ত গাড়িতে বা দূরবর্তী কোনো অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে ভুক্তভোগীকে বেদম মারধর করা হয়। এরপর তার মোবাইল দিয়েই গভীর রাতে পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। বাইরের জেলার লোক হওয়ায় ভুক্তভোগীরা সহজে স্থানীয় পুলিশের সাহায্যও নিতে পারেন না।
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবি এবং প্রশাসনের উদ্যোগ
রোববারের ঘটনাটি স্থানীয়দের চোখ খুলে দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এই চক্রের কারণে ঘাটের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং শ্রমিকরা আতঙ্কে বাজারে আসা কমিয়ে দিচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
মুন্সিগঞ্জ থানা পুলিশ এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জনগণের এই সচেতন ও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু সাময়িক গ্রেপ্তার নয়, এই ঘাটে একটি স্থায়ী পুলিশ বক্স স্থাপন এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি নিশ্চিত করে এই বহিরাগত অপরাধী চক্রকে চিরতরে নির্মূল করতে হবে।